Daily Observer ED Aug 7, 2017

Advertisements

রাষ্ট্রের আধিপত্যের একটি স্বরূপ ভাষার আধিপত্যের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত

অভীক গঙ্গোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার। ইতিমধ্যে তাঁর বেশ কয়েকটি বই বাংলাভাষার পাঠকদের নজর কেড়েছে। তিনি কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের স্নাতকোত্তর। শিক্ষকতার পাশাপাশি সংস্কৃত, ফরাসি ও জার্মান সাহিত্য ও ভাষার প্রতি বিশেষ আগ্রহি। ইংরেজি ও বাংলায় প্রবন্ধ ও সৃজনশীল রচনায় সমান কৃতী। নন্দনতত্ত্ব, বিশ্লেষণধর্মী সাহিত্য-সমালোচনা, বিতর্কিত ঐতিহাসিক বিষয়,দর্শন, মনস্তত্ব ও ধর্মীয় মতবাদ প্রভৃতি বিষয়ের ওপর প্রকাশিত গ্র্রন্থসংখ্যা কুড়ি। এছাড়া ইংরেজি ও বাংলায় সম্পাদিত ছয়টি কাব্যগ্রন্থ ও গল্পসংকলন দেশে ও বিদেশে আলোচিত। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ‘লাইব্রেরি অফ পোয়েট্রি’ থেকে ‘এডিটরস চয়েস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন ২০০২ সালে। বিশিষ্ট ওয়েবজাইন ‘লিটারেচার ক্লাসিকস’ ও ‘ইন্ডিয়ানঅথর.ইন এই দুই জায়গায় বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের বিশেষজ্ঞ উত্তরদাতারূপে একজন।

 

ঢাকা রিভিউ: বিদ্যার দেবী সরস্বতীকে নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ কাজ করার উৎসাহ ও দায়বদ্ধতা কিভাবে পেলেন? সরস্বতী চর্চা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
অভীক গঙ্গোপাধ্যায়: কোন ধারণা যে চিন্তা-শৃঙখলার সাথে যুক্ত, সেই মূল স্রোতের বাইরে এনে তাকে দেখা আমার ভাবনা ও কাজের একটা দিক। আমি গত ১৭ বছর ধরে শিল্পে সাহিত্যে ও ধর্মে “প্রতীক” নিয়ে একটা দীর্ঘ কাজ করে চলেছি। জ্ঞান, কল্পনা, সৃজনে ও অধ্যাত্ম- সাধনায় সরস্বতীর মতো এই প্রতীকের কেন প্রয়োজন হল, বা পাশ্চাত্য Muse-এর থেকে সরস্বতী এত আলাদা কেন—এটা চর্চা করছিলাম। তখন প্রতীক হিসেবে সরস্বতীকে অন্য অনেক কিছু থেকে আলাদা বলে মনে হতে থাকে। এছাড়া উপমহাদেশে আর্য-আক্রমণ- তত্ত্ব (Aryan invasion theory) খণ্ডনে সরস্বতী নদীর ভূমিকা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আর ঐতিহাসিক প্রমাণ Decolonial পাশ্চাত্য ঐতিহাসিকদের যেভাবে “হরপ্পা সভ্যতাই কি ভারতীয় উপমহাদেশের সব থেকে প্রাচীন সভ্যতা” – এই তত্ত্ব কে প্রশ্ন করতে বাধ্য করেছে, তাও আমার চর্চার কেন্দ্রে ছিল। আবার জ্ঞান ও সৃজনকে বিভিন্ন যুগে যে যে প্রেক্ষিতে মানুষ ও সমাজ দেখেছে – এই cultural-anthropological দিকটি পৌরাণিক গল্পগুচ্ছে যে socio-historic psyche বা মননকে ধরতে পারে, সেখানে সরস্বতীকে নিয়ে কাহিনির বিশিষ্টতা —এই ত্রিধারা ভাবনাটিকে বইএর আকারে বাঁধতে সাহায্য করে।
তাই এ বই ঠিক ধর্ম–পুস্তক নয়। ভক্তিভাব আমার মধ্যে হয়ত চিরকালই একটু কম, তাই নৈর্ব্যক্তিক প্রেক্ষিত সহজে নেবার চেষ্টা করি। বিদ্যার দেবীর ওপর যেদিন থেকে দায় চাপিয়ে জ্ঞান-সংস্কৃতি-কলা চর্চার ক্ষেত্রে “যেমন খুশি সাজো” / “যে যত বই পড়ে সে তত মূর্খ” —এই জাতীয় কথা ও ব্যবহারে নিজেদের দায়টা ঝেড়ে ফেলেছি, তখন থেকে পড়ে থাকছে কিছু পৌত্তলিক আচার ও “mixing in free spirit in love”-এই জাতীয় অবশেষ ( বর্তমানে মাঘমাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজার দিনটি এখানে বাঙালীর valentine’s day)। অল্প চর্চিত সরস্বতীকে নিয়ে উপলভ্য তথ্য, আমার সন্ধান ও ব্যাখ্যা এ বইতে রাখার চেষ্টা করেছি।
ভাস্কর্যে চিত্রে সরস্বতীর নান্দনিক গুরুত্ব নিয়ে আরও আলোচনা দরকার। “সিন্ধু-সরস্বতী সভ্যতা” পাশ্চাত্য গবেষকদের মধ্যে উৎসাহ সৃস্টি করলেও আমাদের এখানে উপলভ্য তথ্য-ভিত্তিক প্রত্নতাত্ত্বিক, সমাজতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক সন্ধান ও ব্যাখ্যা আজও নেই। সরস্বতী নদী শুকিয়ে যাবার পর পূর্ব-মুখী যে ডায়াস্পো্রাকে আর্য-আক্রমণ- তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তারও আদ্যন্ত পরীক্ষা প্রয়োজন।

ঢা রি: ক্রিটিকাল লিটারারি থিওরি বিষয়ে আপনার আগ্রহ কবে থেকে কিভাবে শুরু হলো?
অ গ: আমার বাবা প্রয়াত অধ্যাপক সাহিত্যিক মানব গঙ্গোপাধ্যায় ( প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, প্রেসিডেন্সি কলেজ সহ একাধিক সরকারি কলেজ) সাহিত্য-তত্ত্ব ও সমালোচনা-সাহিত্যে বেশ কিছু মৌলিক কাজ ও প্রয়োগ করেন। পাশ্চাত্য সাহিত্য-তত্ত্ব, আধুনিক ও ঊত্তর-আধুনিক তত্ত্বের প্রয়োগ যখন করতেন সেই ৬০-এর দশকে তখন লোকে হাসাহাসি করত। ৭০-এর দশকেও তার আধুনিক মনোবিজ্ঞান, সমাজতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক ও শিল্প-তত্ত্বের প্রেক্ষিতে সমালোচনা-সাহিত্যকে পুষ্ট করাটা প্রথাগত নোট-সর্বস্ব মানসিকতায় গ্রহণ যোগ্য লাগেনি। মুক্ত বুদ্ধির চর্চার জন্য বাবা “Free Thinkers’ Club” প্রতিষ্ঠা করেন, সেখানে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সাহিত্য-তত্ত্ব, শিল্প-তত্ত্ব, দর্শন, মানবতাবাদ, বিশুদ্ধ বিজ্ঞান আলোচনা হত— আমার আগ্রহ সেখানেই ভূমিষ্ঠ হয়।
ক্রিটিকাল লিটারারি থিওরির চর্চা “তত্ত্বের কচকচি” বলে আজও ধরা হয়। আজ কিছু তত্ত্বের নাম উল্লেখ করাটা fashion হয়ে দাড়িয়েছে, ঐ পর্যন্ত। ছাত্রাবস্থায় দেখেছি একটি text-এর নিবিড় পাঠে বিভিন্ন তত্ত্ব-চিন্তার প্রয়োগ অধ্যাপকরা পছন্দ করতেন না । তাই আমার মূল কাজের ক্ষেত্র এটাই।

ঢা রি: ডায়াস্পোরা সম্পর্কে আপনার গবেষণাটাই সম্ভবত এই বিষয়ে প্রথম বাংলা বই। অথচ ইংরেজি ভাষায় এ নিয়ে বহু বিচিত্রগামী বইপত্র আছে। বাংলাভাষায় এতদিন ধরে এই রকম একটা সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ না হওয়ার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে?
অ গ: ঠিক এই কথাটাই বলছিলাম। বাবা বলেছিলেন, “তোর লেখা বাংলায় অনুবাদ হওয়া দরকার। বাংলার অধ্যাপক ও ছাত্রছাত্রীদের সুশিক্ষিত এবং পাঠকদের উন্নত হওয়া আগে দরকার।“ ঊত্তর-আধুনিক সাহিত্য-তত্ত্বের জগতে ডায়াস্পোরা তত্ত্ব একদম সাম্প্রতিক সংযোজন । ইংরেজিতে আমি বইটি প্রথম লিখি, বাংলাভাষায় একটিও কাজ না দেখে পরের ২টি বছর বাংলায় শব্দ তৈরী করে করে এগোতে থাকি। আমি সব প্রেক্ষিতগুলো রাখার পাশাপাশি জোর দিয়েছি ২ টি বিষয়ে : ১) সারা বিশ্বে প্রতি নিয়ত যে কোন কারণে ছিন্নমূল মানুষের অভিঘাত – বা অভিঘাতজাত সাহিত্য ২) বাস্তব ও তাত্ত্বিক দিক থেকে দুটি সংস্কৃতির সম্পূর্ণ সফল সংকরায়ণ সম্ভব নয় ।
বাংলা সমালোচনা-সাহিত্য আপোষ করে চলার নীতি নিয়েছে বহুকাল । সাহিত্যে বাস্তবতার ধারণাটা যেমন একপেশে থেকে গেছে, সাহিত্য-সমালোচনাও আধুনিক অন্তর্ভেদী বিশ্লেষণে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেনা। এটা একটা পরম্পরা হয়ে উঠেছে, তাই সারা বিশ্বে যে সব কাজ হচ্ছে, প্রয়োগ হচ্ছে, তা বাংলায় জায়গা করে নিতে পারছেনা । কটা রচনা postmdernism বা structuralism বা post structuralism বা deconstruction-এর নিরিখে আলোচিত হতে দেখি আমরা ?
তাই বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যের এই আঙিনায় আমার ছোটাছুটি আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে।

ঢা রি:”ভাষার মৃত্যু” বইটি প্রভূত চিন্তার খোরাক জোগায়। এই বইয়ের পরিকল্পনা কিভাবে আসলো প্রথমে।
অ গ: “ভাষা” আমার ব্যক্তিগত পছন্দের একটি ক্ষেত্র । আমার বাবা ৮টি ভাষা জানতেন। আমি এখনও সংস্কৃত, ফরাসি ও জার্মান ভাষার চর্চা করি। বিভিন্ন ভাষার প্রয়োগের বিবর্তন, বিলুপ্তি এমনকি বাংলা ভাষার পরিণতি, যুগে যুগে ভাষার অবক্ষয়ের লক্ষণগুলি কি ছিল, কোনো সাংস্কৃতিক ধারার বিলুপ্তির সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক এবং ভাষার বিলুপ্তির সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক ধারার বিলুপ্তি, ভাষার পুনরুদ্ধার সম্ভব বা সম্ভব নয় কেন, কত ভাষা হারিয়ে গেল, ভাষার ওপর কাজ এত কম কেন—এরকম আরো অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হবার দুঃসাহস থেকেই এই বইএর কাজ শুরু । ২০০৫ থেকে ২০১২ এই ৭ বছর ধরে এই ভাবনা-তথ্য-খোঁজ-সাজানোর ফসল এটি । বাংলায় এই বিষয়ের ওপর বই না থাকাটা সব চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ও উৎসাহ ছিল। আর, ছাপা হোক বা না হোক, প্রকাশক পাই বা না পাই, আমার মা’র নতুন কিছু করার জন্য আমাকে উৎসাহ ও পরিশ্রম এই বইটিকে শেষ করতে সাহায্য করেছে।

ঢা রি: ভাষার মৃত্যু বইতে ‘ভাষার কেন মৃত্যু হয়, প্যারায় বক্তার অভাব বা লেখনির অভাবের চাইতেও কর্পোরেট ভাষার আধিপত্যবাদ গুরুত্বপূণ বলে মনে হয়।ইংরেজি যেমন এখন শাদাতিমির ভূমিকায়? ভাষার ইতিহাস কি মূলত শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস?
অ গ: কথাটা অনেকের পছন্দ না হলেও, আমার বইয়ের শব্দবন্ধে আমি একে “পরাজয়ের ইতিহাস” বলেছি । মৃত্যু আর পরাজয় এক নয় । রাষ্ট্রের আধিপত্যের একটি স্বরূপ ভাষার আধিপত্যের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত। শাসকের (সবসময় শাসক রাষ্ট্র নাও হতে পারে ) প্রভাব-আধিপত্য-দমন-শোষণের একটি হাতিয়ার ভাষা । অর্থনৈতিক রাজনৈ্তিক ও সামাজিক আনুগত্যের মধ্যে ভাষার “পরাজয়ের ইতিহাস” রয়েছে । আনুগত্যের মধ্যে আছে অর্থনৈতিক রাজনৈ্তিক ও সামাজিক আপোষ ও সমঝোতা । আর বিজয়ীর হাসিটির কথা ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকেনা। “All roads lead to Rome” বা “ Be a Roman when you are at Rome” এই বীজটি আজ মহীরুহে পরিণত, যতই এর সমালোচনা বা উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিক প্রতিবাদ হোক না কেন । ভাষার মৃত্যুতো হয়েছেই, কিন্তু গভীরতর সত্য হল পরাজয়। ব্যতিক্রম আছে, আবার ব্যতিক্রম প্রস্তাব বা আইনকে সিদ্ধ করে।
ঢা রি:ভাষার মৃত্যু সম্পর্কে নগুগি আরেক ধাপ এগিয়ে ছিলেন। তিনি তার ডি কলোনাইজিং দ্য মাইন্ড বইতে মানুষকে তার নিজস্ব ভাষামুক্ত মানে তার নিজের ভাষাকে ঘৃণা করতে শেখানোর নিজস্ব কতগুলো কর্পোরেট সিস্টেম সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। আপনি কি মনে করেন?
অ গ: উত্তর-ঔপনিবেশিক চিন্তাবিদরা ঊপনিবেশ ও ভাষার সম্পর্ককে একটি যুগোপযোগী নিরিক্ষায় বিদ্ধ করেছেন –“ …colonial practice of imposing the colonizer’s own native languages onto the peoples they colonized, even forbidding the use of the colonized people’s native tongue…” ভাষা আর সাম্রাজ্যবাদের মুখোমুখি হওয়াটা আটকান সম্ভব নয় ––“…Imperialism is total: it has economic, political, military, cultural and psychological consequences for the people of the world today. It could even lead to holocaust….”— Ngũgĩ wa Thiongo, Decolonising the Mind (2)
প্রবণতা-ভিত্তিক কিছু আলোচনা আমার বইয়ের পরিবর্ধিত সংস্করণে থাকবে । “নিজস্ব ভাষামুক্ত” বা “নিজের ভাষাকে ঘৃণা করা” এই তত্ত্বটি অবশ্য আরও আগের । “যে ভাষা নিয়েই তুমি জন্মাও বা বড় হও, যে ভাষায় তোমার মূল ধর্মগ্রন্থ ( লাতিন, হিব্রু, আরবী, দেবনাগরী ইত্যাদি), সে ভাষা ছাড়া অন্য ভাষাকে ঘৃণা করার কথা –“I hate my mother tongue and regional language”- যুগে যুগে এর নিদর্শন কম নেই ।
নগুগির কর্পোরেট সিস্টেমকে পাল্টা কর্পোরেট সিস্টেম দিয়ে জবাব দেওয়া, এটা ডেভিড ক্রিস্টাল-এর মতো ভাষা- বিজ্ঞানীও কতটা বাস্তবগ্রাহ্য, সেই সংশয় প্রকাশ করেছেন । আমার মনে হয়, কর্পোরেট সল্যুশন অনেকটা টীকার মতো, তাতে socio-psychic বা socio-cultural দাওয়াই নেই । গ্রীক দর্শনের একটি কথা “বেন হুর” ফিল্মের একটি সংলাপে সুন্দর ব্যবহার হয়েছিল, এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে, –How can you fight ? Its not just a God… How can you fight an Idea ? !!!With another Idea ?!! Seldom it has met with success in history…

ঢা রি:আপনার গবেষণা বা কাজ করার প্রক্রিয়াটা কি রকম?
অ গ: সেটা বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে । একসঙ্গে বেশ কয়েকটা বিষয় নিয়ে কাজ করতে আমি অভ্যস্ত। আমি মূলত ইংরেজিতে লিখেছি। একটা ছেলেমানুষি আজও আছে—যে কাজ হয়নি বা কম হয়েছে , সেই ধরণের বিষয় নির্বাচন । পড়াশুনা ভালোবাসি আর ভালোবেসে পড়াশুনা করি বলে প্রকরণের ব্যাপারে আমি গোছানো থাকার চেষ্টা করি । আমার বইয়ের সূচি দেখলে বোঝা যাবে, যে একটা বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যাবার মধ্যে যুক্তিগ্রাহ্য পরম্পরা অনুসরণ করি । কেন্দ্রীয় বিষয়, তার প্রান্তিক ক্ষেত্র, উপলভ্য তথ্য, ব্যাখ্যা, খন্ডন বা সমর্থন, অর্থাৎ পূর্বপক্ষ থেকে উত্তরপক্ষ পর্যন্ত যাওয়া আসাটা হয়ই- এটা আমি উপভোগ করি । বক্তৃতাতেও এই প্রকরণ অজান্তেই চলে আসে । চিন্তাশীল মানুষ ও বন্ধুরা এতে উৎসাহ পেয়েছেন, উৎসাহ দিয়েছেন, তাই মৌলিক প্রকরণ এটাকেই রেখে দিয়েছি ।

ঢা রি: ক্রিটিকাল থিওরির ক্ষেত্রে আপনার শেষ বইটি ‘সাহিত্যতত্ত্ব ও সমালোচনা-সাহিত্য বিবর্তনে অনুবর্তনে’ একটা সাম্প্রতিক বাংলাসাহিত্যে চমৎকার কাজ বলে মনে করি আমরা।সমালোচনা সাহিত্যে আমাদের অবস্থান সম্পর্কে বলুন।
অ গ: ধন্যবাদ। বাংলায় অনেক কাজ অনুবাদ হওয়া দরকার। এখানে থিওরির বই নিয়ে প্রকাশকদের উৎসাহের খুব অভাব আছে। তত্ত্বের সঙ্গে জীবনকে যোগ করে আমরা হয়ত বোঝাতে পারিনি । একটা তত্ত্ব Text-এর Practical Criticism-এর মধ্য দিয়েই গ্রহণযোগ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক । তত্ত্বের বিমূর্ত দিকটা Text-এর মূর্ত অবয়বের বৃত্তে সম্পূর্ণ হবে, এই কাজটি এখানে হয়না । এখানে ক্রিটিকাল থিওরির চর্চা ও প্রয়োগ, আলোচনা, বক্তৃতা হাতে গোনা । সচেতন প্রয়াস চোখে পড়ে না ।

ঢা রি:বাংলাভাষায় ক্রিটিকাল চিন্তাচর্চার ভবিষ্যত কি?
অ গ: বহু বিষয়ের সঙ্গে ন্যুনতম যোগাযোগ না থাকলে তত্ত্ব বা থিওরি যে প্রাণহীন, আমার মনে হয়, বাংলার ক্রিটিকাল থিওরি চর্চা অনেকটা সেখানেও আটকে আছে । হাওয়ায় কিছু শব্দ ব্যবহার না করে, বছরে দুটো Tutorial/Assignment-এ সীমাবদ্ধ না রেখে, বাংলা সাহিত্য ও শিল্পের বিপুল ভাণ্ডারে প্রয়োগ না করলে সাহিত্যের সম্ভাবনাই যাচাই করা হবেনা ।

ঢা রি: ইংরেজি আর হিন্দির দাপটে উভয় বাংলায় মনে হয় বাংলাভাষার একটা সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। আপনার মতে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাভাষার ভবিষ্যত কি?
অ গ: বাংলাদেশ একটা ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিয়েছে । হয়ত ভবিষ্যতে আরেকটা আন্দোলন লাগবে সম্মান রক্ষা করতে ।
তবে এখানে বিনাযুদ্ধে বাংলাকে “BONG” করে ফেলার পর, বিদ্যালয় স্তর থেকে অভিভাবকদের বাংলা ছাড়ানোর হিড়িকে, “ বাংলাটা ঠিক আসেনা “ বলার গর্বে বলীয়ান বাঙালির মাঝে আছি । বাংলাদেশের বাংলা ভাষা বিবর্তন দেখবে স্বাভাবিকভাবেই । এখানে আমার ‘ভাষার মৃত্যু’ বইতে বিপন্ন ও সদ্যমৃত ভাষার তালিকায় বাংলা ভাষা আমার জীবনে লিখে যেতে না পারলেই শান্তি ।
তবুও কিছু মানুষ নীরবে কাজ করে চলেন, যাচ্ছেন, তাঁরা বাঁচাবার লড়াই করবেন , …করছিও…ভূতের ভবিষ্যত না হলেই হল…।